প্রচ্ছদ > খেলা > ফুটবল

ইংল্যান্ডকে বধ করতে কুসংস্কারের আশ্রয় নিচ্ছেন আর্জেন্টাইনরা

article-img

চলতি বিশ্বকাপে মাঠের লড়াইয়ে লিওনেল মেসিরা কোনো খামতি রাখছেন না ঠিকই, কিন্তু মাঠের বাইরে আর্জেন্টাইন সমর্থকরাও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালের আগে ম্যাচ নিজেদের পক্ষে আনতে ও ইংলিশ তারকাদের স্তব্ধ করতে বিচিত্র সব কুসংস্কার ও রীতিনীতির আশ্রয় নিচ্ছেন আলবিসেলেস্তে ভক্তরা। 

এই রীতিনীতিগুলো আর্জেন্টিনায় ‘কাবালা’ নামে পরিচিত, যা ফুটবলার ও সমর্থকদের মধ্যে এক গভীর লোকবিশ্বাস হিসেবে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। 

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ভক্তরা এমন সব অদ্ভুত নিয়ম মেনে চলছেন, যা অতীতে দলকে জয় এনে দিয়েছে বলে তাদের বিশ্বাস। 

এই যেমন, জয়ের ধারা বজায় রাখতে অনেকে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের নাম মুখে নেন না, বছরের পর বছর না ধুয়ে রাখা একই জার্সি গায়ে চাপান, খেলা দেখার সময় একই আসনে বসেন এবং প্রতি ম্যাচে একই খাবার খান। 

তারা বিশ্বাস করেন, এর সামান্যতম পরিবর্তনও দলের কপাল পুড়িয়ে দিতে পারে! 

আর্জেন্টিনার ১৩ বছর বয়সি কিশোরী সমর্থক ইনেস মুত্রি তার বন্ধুদের সঙ্গে এক বিশেষ কাবালা মেনে চলে। সে জানায়, ‘আমার ও আমার বন্ধুদের একটা নিজস্ব নিয়ম আছে। আমরা প্রতিপক্ষ দলের মূল তারকা খেলোয়াড় এবং গোলরক্ষকের নাম একটা কাগজে লিখে তা ডিপ ফ্রিজে জমিয়ে রাখি। এবার আমরা হ্যারি কেইনের নাম ফ্রিজে জমাতে যাচ্ছি, কারণ ও ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা।’ 

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এই লোকবিশ্বাস এখন ডিজিটাল রূপও নিয়েছে। 

এবারের বিশ্বকাপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি এমন অনেক ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের বরফের ব্লকের ভেতর জমে থাকতে দেখা যাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—যাতে মাঠে প্রতিপক্ষের সেরা খেলোয়াড়রা নড়াচড়া করতে না পারেন, গোল করতে না পারেন বা গোল ঠেকাতে না পারেন! 

১৮ বছর বয়সি শিক্ষার্থী হুয়ান পাবলো কালভো যেমন জানান, তিনি ইংল্যান্ডের তারকা মিডফিল্ডার জুড বেলিংহামের নাম কাগজে লিখে ফ্রিজে জমা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 

বিলার্দো থেকে স্কালোনি: কুসংস্কারের গভীর শিকড়

আর্জেন্টিনায় ফুটবল এক প্রকার ধর্মের মতো, আর এই ধরনের অন্ধবিশ্বাস তাদের ম্যাচ নিয়ে মানসিক স্বস্তি দেয়। এই ঐতিহ্যের শিকড় অনেক গভীরে। 

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী কোচ কার্লোস বিলার্দো তার বিচিত্র সব কুসংস্কারের জন্য কুখ্যাত ছিলেন—যেমন মাঠে কে কোন ক্রমানুসারে পা রাখবে, তা তিনি কঠোরভাবে ঠিক করে দিতেন।

এমনকি বর্তমান বিশ্বজয়ী কোচ লিওনেল স্কালোনিও নিজের এক ‘কাবালা’র কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ‘আমি সবসময় ডান পা দিয়ে মাঠে প্রবেশ করি এবং বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকি।’ 

এদিকে, ইংরেজদের বিপক্ষে এই ম্যাচের মাধ্যমে আবারও পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এক দ্বৈরথ—যা ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল থেকে শুরু করে বহু ঐতিহাসিক নকআউট লড়াইয়ের স্মৃতি বহন করে। 

সেমিফাইনালের এই ম্যাচে তাই ম্যারাডোনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপের আদলে তৈরি রেপ্লিকা জার্সি পরেই খেলা দেখতে বসবেন কালভো। তার মতে, ‘মেসি তার ক্যারিয়ারে সম্ভাব্য সব ট্রফি জিতলেও, বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই স্তরে (সেমিফাইনালে) আগে কখনো মুখোমুখি হননি। তাই এটি একটি অনন্য ম্যাচ।’ 

সমর্থকদের মতে, ‘কাবালা’র মূল চাবিকাঠি হলো হুবহু পুনরাবৃত্তি করা। একবার আর্জেন্টিনা জিতে গেলে পরবর্তী ম্যাচের দিন আগের ম্যাচের প্রতিটি নিখুঁত বিষয় পুনরায় ফিরিয়ে আনতে হয়—একই মানুষ, একই আসন, একই জামা এবং সম্ভব হলে একই দুপুরের খাবার।

কিশোরী মুত্রি তার আট বন্ধুর সঙ্গে মাথায় একই টুপি পরে এবং একই জায়গায় বসে সেমিফাইনাল উপভোগ করার অপেক্ষায় আছে। হাসিমুখে সে বলে, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি তীব্র স্নায়ুচাপের হবে জানি, তবে আমরা আমাদের নিয়ম মেনেই আনন্দ নিয়ে খেলা দেখব।’